sliderস্থানীয়

অমিত সম্ভাবনার মেট্রোরেল যোগাযোগ ব্যবস্থার নতুন দিগন্ত

মুহাম্মদ আমির উদ্দিন কাশেম, মৌলভীবাজার প্রতিনিধি : ২০৪১ সাল নাগাদ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বপ্নের সোনার বাংলার আধুনিক রূপ স্মার্ট বাংলাদেশ বিনির্মাণের নতুন একটি রূপকল্প দিয়েছেন জননেত্রী শেখ হাসিনা। সেই স্মার্ট বাংলাদেশ বিনির্মাণে অনেকগুলো মেঘা প্রজেক্ট হাতে নেয়া হয়েছে তন্মধ্যে অন্যতম হচ্ছে মেট্টোরেল।

দেশবাসীর কাংক্ষিত এই মেট্টোরেল দেশের অর্নৈতিক উন্নয়ন, ব্যবসার প্রসার, পরিবেশগত দূষণ নিয়ন্ত্রণ, যানজট নিরশন, কর্মসংস্থানের প্রসার, এবং প্রযুক্তির ব্যবহারে বিরাট ভূমিকা রাখবে।

১. যানজট নিরসনঃ
যানজটের কারণে ঢাকায় ব্যাপক অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়। একটি সমীক্ষায় দেখা যায় অনুসারে ঢাকা শহরের যানজটের জন্য বার্ষিক ৪.৪ বিলিয়ন ডলার অপচয় হয়। আর যানজটের কারণে প্রতিদিন ৩.৮ মিলিয়ন কর্মঘণ্টা নষ্ট হয়। নষ্ট কর্মঘণ্টার মূল্য বিবেচনায় নিলে ক্ষতির পরিমাণ বিশাল আকার ধারণ করে যা জাতীয় অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব সৃষ্টি করে।
মেট্রোরেল প্রকল্পটি প্রতি বছর ২.৪ বিলিয়ন ডলার সাশ্রয় করবে। তা ছাড়া মেট্রোরেল ঢাকার ১৫ মিলিয়নেরও বেশি মানুষের জন্য যাতায়াত সহজ করবে এবং দৈনন্দিন জীবনযাত্রাকে গতিশীল করবে, যা অর্থনীতিতে একটি বড় ইতিবাচক প্রভাব তৈরি করবে।

২. কর্মসংস্থানঃ
মেট্রোরেল পরিচালনা এবং রক্ষণাবেক্ষণের জন্য প্রচুর লোকবলের নিয়োগ হয়েছে। প্রতিটি মেট্রোরেল স্টেশনে একটি অপারেটিং রুম, টিকিট কাউন্টার, লাউঞ্জ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা প্লান্ট, প্রার্থনার স্থান, অগ্নি নির্বাপক ব্যবস্থা, এসকেলেটর, লিফট ইত্যাদি সুবিধা প্রদানে প্রচুর কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃস্টি হয়েছে।
তাছাড়া, স্টেশনগুলির আশেপাশের বাণিজ্যিক কেন্দ্রগুলিতে ব্যবসা পরিচালনার জন্য একগুচ্ছ কর্মীর প্রয়োজন হবে। এই সমস্ত কর্মসংস্থান আর্থিক কার্যকলাপ বৃদ্ধি করবে এবং শেষ পর্যন্ত জাতীয় অর্থনীতিতে অবদান রাখবে।

৩. স্টেশনের চারপাশে ব্যবসাঃ
মেট্রোরেলের কারণে, ট্রানজিট ব্যবস্থা বাড়ছে, এবং স্টেশনগুলির আশেপাশে অসংখ্য ব্যক্তিগতভাবে পরিচালিত ব্যবসা গড়ে উঠছে। উন্নত পরিবহন পরিকাঠামোর কারণে, নতুন সংস্থাগুলি বিকাশ লাভের সুযোগ পাবে, অন্যদিকে বর্তমান ব্যবসাগুলি উপকৃত হবে।
সামগ্রিকভাবে, স্টেশন এবং রুটের কাছাকাছি স্থাপন করা এই ব্যবসাগুলি দেশের জিডিপিতে যথেষ্ট অবদান রাখবে।

তা ছাড়া, অনেক মেট্রোস্টেশন এলাকার বাণিজ্যিক উন্নয়ন ঘটবে এবং রুটের চারপাশে বাসা, ব্যবসা, গুদামের সুবিধার ভাড়া বাড়বে। আবাসিক ভবন বাণিজ্যিক সুবিধার জন্য পুনঃমূল্যায়ন করা হবে।

৪. সুবিধা এবং নিরাপত্তাঃ
ঢাকা শহরে অফিস টাইমে বাস না পাওয়া, অতিরিক্ত ভিড় ইত্যাদি কারণে ঢাকা শহরের মানুষ চরম ভোগান্তিতে পড়তে হতো। উবার,পাঠাও, ট্যাক্সি এবং সিএনজি ইত্যাদি ছিল বাসের বিকল্প। কিন্তু অতিরিক্ত ভাড়া, ‘মিটার ভাড়া’ ব্যবহার না করার প্রবণতা এবং চালকদের অপেশাদার আচরণে জনগণের জন্য সীমাহীন দুর্ভোগ সৃষ্টি করে আসছে।

ঢাকাবাসীর যাতায়াতের একটি সুবিধাজনক মাধ্যম হবে মেট্রোরেল। কারণ এটি প্রচুর যাত্রী ধারণ ক্ষমতা সহ একটি শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত পরিবহন সুবিধা প্রদান করবে, সব রুট চালু হলে প্রতি ঘন্টায় প্রায় ৬০,০০০ যাত্রী বহন করবে এবং প্রতি ৪ মিনিটে প্রতিটি স্টেশনে একটি ট্রেন উপলব্ধ হবে।

৫. নারী বান্ধব মেট্রোরেলঃ
বিদ্যমান গণপরিবহন ব্যবহারে নারীরা প্রায়ই বাধার সম্মুখীন হন। এর মধ্যে রয়েছে অফিস টাইমে দীর্ঘ অপেক্ষার সময়, শারীরিক বা মৌখিক হয়রানি, আসনের স্বল্পতা, নিরাপদে বাসে ওঠা বা নামানো এবং উপযুক্ত পরিবহন খুঁজে পাওয়া, বাস স্টপে টয়লেট না থাকা ইত্যাদি বিশেষ ভাবে উল্লেখযোগ্য। মেট্রো রেলে ভ্রমণে এসব সমস্যার সমাধান হবে, ফলে কর্মক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ বাড়বে, আর জাতীয় জিডিপিতে ভূমিকা রাখবে।

৬. প্রযুক্তিগত অগ্রগতিঃ
মেট্রোরেল আমাদের দেশের জনসংখ্যাকে প্রযুক্তিগত অগ্রগতির একটি নতুন যুগে প্রবেশ করবে। বাংলাদেশে এরই মধ্যে মেট্রোরেল নেটওয়ার্ক ব্যবস্থা তৈরি করা হয়েছে। সিস্টেমটি ধীরে ধীরে সব ধরনের পাবলিক ট্রান্সপোর্টে প্রসারিত করা যেতে পারে। এটি দেশের পরিবহন ব্যবস্থায় ডিজিটালাইজেশন আনার পাশাপাশি ধীরে ধীরে ক্যাশলেস বা নগদ টাকা বিহীন অর্থনীতির দিকে এগিয়ে যেতে সাহায্য করবে।

৭.শহরের বিকেন্দ্রীকরণঃ
মেট্রোরেল চালু হলে ঢাকা শহর থেকে জনসংখ্যার ঘনত্ব কমানো যাবে। মানুষ বাসা ভাড়া অনেক কম খরচ করে শহরের বাইরে থাকতে পারবে এবং অফিস ও অন্যান্য কাজে সহজে ঢাকায় আসতে পারবে। উদাহরণস্বরূপ, গাজীপুর বা নারায়ণগঞ্জ এলাকায় বসবাসকারী লোকেরা সমস্ত রুট সম্পূর্ণ হয়ে গেলে এক ঘন্টারও কম সময়ের মধ্যে ঢাকা শহরে যেতে পারবে। প্রতিটি মেট্রোরেল রুটেই ভবিষ্যতে সম্প্রসারণের সুযোগ রয়েছে। বর্তমানে এসব এলাকায় বসবাসকারী লোকজনও সেখানে বসবাস না করে মূল শহরের কর্মস্থলে যোগ দিতে পারবেন। ফলে মানুষ কেন্দ্রীয় শহর থেকে বিকেন্দ্রীভূত হবে।

৮. পরিবেশের উপর সুপ্রভাবঃ
ঢাকার রাস্তায় চলমান সমস্ত যানবাহন জীবাশ্ম জ্বালানির উপর নির্ভর করে, যা পরিবেশ দূষণে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখে। মেট্রো রেল রাজধানীর পরিবেশে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। যেহেতু মেট্রোরেল ‘বিদ্যুৎচালিত’ এবং প্রতি ঘণ্টায় বেশি যাত্রী বহন করতে পারে, তাই ঢাকায় বাস ও অন্যান্য পরিবহনের মাধ্যমে যাতায়াতের প্রবণতা কমে যাবে। এতে সড়কে যানবাহনের সংখ্যা কমবে, যা পরিবেশের জন্য উপকারী হবে। এর পাশাপাশি, শব্দ, শক এবং কম্পন কমাতে মেট্রো রেলে ম্যাস স্প্রিং সিস্টেম [এমএসএস] প্রযুক্তি ব্যবহার করছে। শব্দ দূষণ রোধে কংক্রিটের পাশের দেয়ালও করা হয়েছে। ফলে মেট্রোরেল পরিবেশের উপর সুপ্রভাব ফেলবে।

কাজেই, বলা যায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দূরদর্শী চিন্তার ফসল মেট্রোরেল অমিত সম্ভাবনার দোয়ার খুলে দিয়েছে। উন্নয়নের এই যাত্রার আসুন সকলে একতাবদ্ধ হয়ে সকল দেশি-বিদেশি অপশক্তির ষড়যন্ত্র মোকাবিলা করে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর হাতকে শক্তিশালী করি।

Related Articles

Back to top button